August 14, 2019 A- A A+

কাশ্মিরি শিশু তালহা জাতীয় পুরস্কার জেতার খবর পেলো না ঈদের দিনেও

বিনোদন ডেস্ক : মাত্র আট কী নয় বছর বয়স হবে কাশ্মিরি শিশুটির। শ্রীনগর থেকে বেশ কিছুটা দূরেই একটি ছোট্ট গ্রামে বাস তার। নিষ্পাপ মুখের হাসি আর তুখোড় অভিনয়ে এরইমধ্যে গোটা ভারতের মন জয় করে নিয়েছে তালহা আর্শাদ রেশি। সাড়া জাগানো ‘হামিদ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য এ বছরের সেরা শিশুশিল্পী হিসেবে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নিয়েছে তালহা। পুরস্কার বাছাইয়ের জুরিরা একবাক্যে রায় দিয়েছেন, এই সম্মানের জন্য ওই কাশ্মিরি শিশুটির চেয়ে যোগ্য আর কেউ নেই।
কিন্তু শুক্রবার সেই পুরস্কার জেতার খবর ঘোষণার পর পুরো তিন দিন কেটে গেলেও এই সুখবর এখনও তালহার কাছেই পৌঁছায়নি। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে ৩৭০ ধারা বিলোপের জের ধরে গত আটদিন ধরেই টেলিফোন-মোবাইল-ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। ফলে ঈদের দিনেও এত বড় পুরস্কার জেতার খবরটা তালহা নিজেই জানতে পারেনি।
‘হামিদ’ ছবির পরিচালক আইজাজ খান সোমবার দুপুরে মুম্বাই থেকে বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন, ‘আমি গত তিনদিন ধরে পাগলের মতো চেষ্টা করছি কোনোভাবে তালহার কাছে এত বড় খবরটা পৌঁছে দিতে। কিন্তু ওর নম্বরে তো নয়ই, ওর বাবা-মা কারও নম্বরেই কোনও সংযোগ পাচ্ছি না।’
অবশেষে এদিন দিল্লি থেকে শ্রীনগর যাচ্ছেন, এমন এক বন্ধুকে আইজাজ খান অনুরোধ করেছেন একটু কষ্ট করে তালহার গ্রামে গিয়ে খবরটা তার বাড়িতে পৌঁছে দিতে। সে খবর কাল-পরশু কবে পৌঁছবে, তাও এখন পর্যন্ত সঠিকভাবে জানা নেই।
ফলে ভারতের সেরা শিশুশিল্পী এখন দিন কাটাচ্ছে কারফিউ আর ব্ল্যাকআউটের মধ্যে। ফৌজি টহল, ব্যারিকেড পেরিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সেরা সম্মান জিতে নেওয়ার খবর তার বাড়ির দোরগোড়ায় আসতেই পারেনি!
কথাশিল্পী আমিন ভাটের নাটক ‘ফোন নাম্বার ৭৮৬’ অবলম্বনে গত বছর নির্মিত হয়েছিল ‘হামিদ’ সিনেমাটি। আর সেখানেই নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিল কাশ্মিরি শিশু তালহা আর্শাদ রেশি।
‘হামিদ’ আসলে কাশ্মিরের এমন একটি বাচ্চা ছেলের গল্প, যার বাবা হারিয়ে গেছে– আর সেই শোকে মায়েরও প্রায় পাগল হওয়ার দশা। বাবাকে ফিরে পাওয়ার মরিয়া চেষ্টায় হামিদ তার বাবার মোবাইল ফোন থেকে ৭৮৬ নম্বরে ফোন করে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে, আল্লাহকে বলতে চায়, ‘প্লিজ আমার আব্বুকে ফিরিয়ে দাও!’
সেই ফোন কোনোভাবে কানেক্ট হয়ে যায় কাশ্মিরে মোতায়েন ভারতের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর এক জওয়ান অভয়ের সঙ্গে।
সেই অভয়কেই এরপর হামিদ ধরে নেয় আল্লাহ হিসেবে, আর তারপর দুই অসম বয়সী বন্ধুর মধ্যে টেলিফোনেই গড়ে ওঠে এক অনাবিল ও বিচিত্র স্বর্গীয় সম্পর্ক।
ফৌজি বুটের পদধ্বনিতে কম্পিত কাশ্মিরে এক পিতৃহারা শিশুর যন্ত্রণা আর রাষ্ট্রের হয়ে কর্তব্য করতে আসা সেনা জওয়ানের দ্বিধা-সংশয়-মানবিকতা সেই ছবিতে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
‘হামিদ’-এ অভিনয়ের জন্য তালহা শুধু সেরা শিশুশিল্পীর সম্মানই পায়নি, এই ছবিটি ভারতে এ বছর সেরা উর্দু ছবির পুরস্কারও জিতে নিয়েছে।
এই ছবিটির আর একটি বিশেষত্ব হলো, ‘হামিদ’-এর পুরো শুটিং হয়েছে জম্মু ও কাশ্মিরের নানা প্রান্তে। হিমাচলে বা উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ে শুটিং করে সেটাকে কাশ্মির বলে চালানোর কোনও চেষ্টাই করেননি পরিচালক।
ছবিতে হামিদের বাবা রেহমাত ও মা ইশরাতের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন যথাক্রমে সুমিত কাউল ও রসিকা দুগ্গাল। সিআরপিএফ জওয়ানের ভূমিকায় দেখা গেছে বিকাশ কুমারকে, আর তাদের প্রত্যেকের অভিনয়ই সমালোচকদের বিরাট প্রশংসা কুড়িয়েছে।
তবে হামিদ ছবিটির তারকা অবশ্যই তালহা, যে বাচ্চা ছেলেটি এরইমধ্যে গোটা ভারতের মন জয় করে নিয়েছে।
আইজাজ খান এ প্রতিবেদককে বলছিলেন, ‘যেদিন একটা ছেঁড়াখোঁড়া ফেরান (সাবেকি কাশ্মিরি পোশাক) আর মাথায় ফেজ টুপি পরে তালহা শ্রীনগরে আমাদের হোটেলে অডিশন দিতে এলো, সেদিনের ছবিটা এখনও চোখে ভাসছে। আমাদের গোটা টিম সজোরে হাততালি দিয়ে উঠেছিলাম, এতদিনে আমরা আসল বাচ্চাটাকে পেয়ে গেছি!’
কিন্তু তালহার সেই অভিনয়ের অনবদ্য স্বীকৃতির খবরটাই এখনও তার কাছে পৌঁছে দেওয়া গেল না, ‘হামিদ’-এর পুরো টিমের আফসোস সেখানেই!

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail