May 9, 2018 A- A A+

সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরছে প্রাণ

নিষ্ঠুর, মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক শব্দগুলো সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এখন আর যেন কার্যকর নয়। বাংলাদেশে যেভাবে, যে হারে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, তাকে এখন আর স্বাভাবিক বলা যায় না। এ দুর্ঘটনাকে ‘হত্যাকান্ড’ হিসেবে সচেতন ও সুশীল নাগরিকরা অনেক আগেই চি‎িহ্নত করেছেন। সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনা যেন মহামারি আকার ধারণ করেছে। একের পর এক কেড়ে নিচ্ছে কর্মজীবী মানুষের প্রাণ। সম্প্রতি বাসচালকের পাল্লা দেয়ার প্রতিযোগিতায় মর্মান্তিকভাবে নিহত হওয়া রাজীব, নিউ মার্কেট এলাকায় দুই বাসের প্রতিযোগিতার মাঝে চাপা পড়ে এক গৃহবধূর পঙ্গু হয়ে যাওয়া, গৃহকর্মীর পা হারানো, আইন ভঙ্গ করা বেপরোয়া বাস থামাতে গিয়ে ট্রাফিক ইন্সপেক্টরের পা পিষ্ট হওয়া থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ বেপরোয়া চালকদের নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছেন। এছাড়া রাজধানীসহ সারা দেশে দুর্ঘটনায় প্রাণ ঝরছে অসংখ্য মানুষের। একটি দৈনিকের হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৩ হাজার ৯৭০ জন। আহত হয়েছে শত শত। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, গত ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ১৭৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ১৮৪১ জন, আহত হয়েছেন ৫৪৭৭ জন। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ২৮৮ জন। পরিতাপের বিষয়, যে যাত্রীদের জন্য গণপরিবহণের অস্তিত্ব, বেপরোয়া চালকদের কারণে সেই যাত্রীদেরই একের পর এক প্রাণ যাচ্ছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, যাদের ভুলের জন্য দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, সেই চালকদের অধিকাংশই কিভাবে যেন দুর্ঘটনা থেকে প্রাণে বেঁচে যায়। এতে মনে হতে পারে, চালকরা যেন গাড়ি চালানোর দক্ষতা অর্জনের চেয়ে দুর্ঘটনায় পড়লে কিভাবে পালিয়ে যাওয়া যায়, এ প্রশিক্ষণই বেশি নিয়ে থাকে। যাত্রী বা পথচারীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার এ প্রবণতাকে কি দুর্ঘটনা বলা যায়? বিশিষ্ট সাংবাদিক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার বাসার কাজের মেয়ে রোজিনার মৃত্যুর পর তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশেই এমন বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো হয় না। দেশে পরিবহণ মালিক আর শ্রমিক মিলে একটি ভয়ংকর চক্রের সৃষ্টি হয়েছে। এ চক্র কাউকেই মানে না। কারণ এ চক্রের ওপর প্রভাবশালীদের আশীর্বাদ রয়েছে। এ কারণে তারা কাউকে পাত্তা দেয় না। মানুষ খুন করে তারা উল্লাস করে। সড়ক দুর্ঘটনা এমনই যে এতে কোন শ্রেণীভেদ থাকে না। ধনী-দরিদ্র, রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট ব্যক্তি এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও রেহাই পায় না। বলা যায়, বেপরোয়া ও দুর্বিনীত গাড়ি চালকরা এদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। এদের কারণে যেসব দুর্ঘটনা ঘটে এবং যেসব মানুষ মৃত্যুবরণ করেন তার শতকরা ৭০ ভাগই কর্মক্ষম এবং দেশের অর্থনীতিতে তাদের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে বলে এক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। যারা আহত হয়ে অচল হয়ে পড়েন, তারা পরিবার ও সমাজের বোঝায় পরিণত হন। বিশ্বব্যাংকের এক হিসেবে দেখানো হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় অর্থনৈতিক ক্ষতি জিডিপি’র ১ শতাংশের বেশি। দুর্ঘটনায় কর্মক্ষম এসব মানুষের হতাহতের ঘটনায় তাদের পরিবারে কি দুর্বিষহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, তা কেবল তারাই জানে। গত সপ্তাহে বঙ্গোপসাগরে একটি জাহাজের ধাক্কায় ট্রলার ডুবিতে ২৫ জন নিখোঁজ হওয়ার মধ্যে একটি পরিবারের এক আত্মীয়কে বলতে দেখা যায়, নিখোঁজ ব্যক্তির চারটি ছোট ছোট সন্তান ও স্ত্রী রয়েছে। এখন তাদের কি হবে! কে তাদের ভারণপোষণ ও মানুষ করার দায়িত্ব নেবে। এমন শত শত পরিবার রয়েছে, যারা সড়ক দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে এক অনিশ্চিত জীবনের দিকে ধাবিত। চালক বেঁচে গিয়ে হয়ত তার পরিবার অনিশ্চয়তার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু তার কারণে যার বা যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের পরিবারগুলোর কি হয়েছে, তা কি কখনো ভেবে দেখেছে? তার হাতে যে রক্তের দাগ লেগে রইল, এ দাগ কি কখনো মুছতে পারবে? সে যে পরিবহণ প্রতিষ্ঠানের গাড়িটি চালিয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকরা কি এ বিষয়টি কখনো ভেবেছে বা নিহতদের পরিবারের খোঁজ নিয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও কি কখনো তাদের খোঁজ-খবর নিয়েছে। এমন সংবাদ আমরা কখনো পাই না। বরং আমরা এ সংবাদ দেখেছি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে দুর্ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করতে এবং চালককে ‘ঘাতক’ বলা যাবে না বলে তীব্র আপত্তি করতে। এর অর্থ হচ্ছে, গণপরিবহনের সাথে সংশ্লিষ্ট চালক এবং মালিকদের এক ধরনের দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। তারা অদক্ষ ও অযোগ্য হলেও তাদের কারণে দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু হলে, তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। তারাই ঠিক। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে তারা যেভাবে খুশি সেভাবে গাড়ি চালাবে, এতে দুর্ঘটনা ঘটলে তাদের টিকিটিও ধরা যাবে না। দায়মুক্তির এই প্রবণতা থেকে যতদিন না বের হয়ে আসা যাবে, ততদিন মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক যে শব্দেই প্রকাশ করা হোক না কেন, দুর্ঘটনা যে ঘটবে তাতে আশঙ্কার অবকাশ নেই। ট্রাফিক পুলিশ বিভাগের এক হিসেবে দেখানো হয়েছে, গত ১৫ বছরে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৪ হাজার। বিশ্বব্যাংক বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে এ সংখ্যা আরও বেশি। এ বছরই গত ১১ মাসে সারা দেশে নিহত হয়েছে ১৪ হাজার ৭০০ জন। আহত হয়েছে ১০ হাজারের বেশি। এসব দুর্ঘটনার বেশিরভাগই ঘটেছে চালকের ভুল এবং বেপরোয়া মনোভাবের কারণে। এটাই হওয়া স্বাভাবিক। যে দেশে শতকরা ৯০ ভাগ চালক ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালায়, সেখানে দুর্ঘটনার হার ও মানুষের হতাহতের ঘটনা এবং পরিবার-পরিজনের হাহাকার ও আর্তনাদ কমার কোন কারণ নেই। বিশ্বের কোন সভ্য দেশে মানুষ মারার এমন চলমান অস্বাভাবিক গণপরিবহণ ব্যবস্থা আছে কিনা, আমাদের জানা নেই। উন্নত বিশ্বে নির্দিষ্ট স্থানে গাড়ির গতিসীমা সামান্য অতিক্রম এবং লেন পরিবর্তন করলেই সংশ্লিষ্ট গাড়ি চালকের অরিজিনাল লাইসেন্স স্থগিত, এমনকি বাতিল করে দেয়া হয়। সেই চালককে পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে লাইসেন্স ফেরত পেতে হয়। আমাদের দেশে এসব নিয়ম কানুন দূরে থাক, যে সংস্থা ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয় তাদের বিরুদ্ধেই জাল লাইসেন্স প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। তার উপর রয়েছে গাড়ি চালক, শ্রমিক সংগঠন এবং পরিবহন মালিকদের বেপরোয়া মনোভাব। জাল লাইসেন্স ও ফিটনেস বিহীন গাড়ি ধরলে বা অভিযান চালালে তারা হয় পরিবহণ ধর্মঘট না হয় কৌশলে গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তিতে ফেলে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ বিভিন্ন সূচকে এগিয়ে যাচ্ছে। সড়ক যোগাযোগ উন্নত হচ্ছে, একের পর এক ফ্লাইওভার নির্মিত হচ্ছে। কিন্তু গণপরিবহণে যেসব অনিয়ম চলছে এবং বেড়ে চলেছে, এ ক্ষেত্রে কার্যকর কোন ব্যবস্থা কেন নেয়া হচ্ছে না? এ খাতটিকে কেন নিরাপদ ও শৃঙ্খল করা হচ্ছে না? এ খাত এবং এর সাথে জড়িতদের যদি সংস্কার ও সুশৃঙ্খল করা না যায়, তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা যতই উন্নত করা হোক এবং যতই ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হোক না কেন, তাতে কোন লাভ হবে না। বেপরোয়া চালক ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি মসৃন রাস্তা ও ফ্লাইওভারেও দুর্ঘটনা ঘটাবে।

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail